কাতারে তালেবানের বৈঠক নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের এতো আগ্রহ কেন?

কাতারের রাজধানী দোহায় চলছে আফগান শান্তি আলোচনা। আফগানিস্তানের মার্কিন সমর্থিত সরকার ও তালেবানের মধ্যে এতো বৃহৎ পরিসরে এটিই প্রথম মুখোমুখি আলোচনা। সমঝোতা চেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পেন্স-ও এতে অংশ নিয়েছেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহেই দোহায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে কাতারের এই বৈঠকের দিকে আফগান জনগণের যতটা নয়, তার চেয়ে হয়তো বেশি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে আফগানিস্তানের দুই প্রতিবেশী- ভারত ও পাকিস্তান।

ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে দোহার এই বৈঠকে কী মীমাংসা হয় তার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই বৈরী প্রতিবেশীর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

যেদিন থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারে তার সংকল্পের কথা প্রকাশ করেন, তখন থেকেই ভারত ও পাকিস্তান ভবিষ্যতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে তাদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে বিশেষ তৎপর হয়েছে।

ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই আফগানিস্তানে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা চায়। তবে কীভাবে তা নিশ্চিত হবে তা নিয়ে তাদের অবস্থানে বিশাল ফারাক। অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান যতটা না চিন্তিত তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ভবিষ্যতে সেখানে তারা দুই দেশ কে কাকে বেশি ঘায়েল করতে পারবে তা নিয়ে।

পাকিস্তান কী চায়!

ইসলামাবাদে নিরাপত্তা বিশ্লেষক হাসান আসকার রিজভি বিবিসি-কে বলেন, পাকিস্তান এখন সত্যিই আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা চাইছে। কিন্তু তারা চায় এমন একটি সরকার কাবুলে ক্ষমতায় থাকবে যাদের সঙ্গে ভারতের চেয়ে তাদের ঘনিষ্ঠতা বেশি হবে।

পাকিস্তান মুখে সব সময় বলে যে, তাদের প্রধান চিন্তা আফগানিস্তানের শান্তি ও স্থিতিশীলতা। কোন সরকার কাবুলের ক্ষমতায় বসলো সেটা তাদের বিবেচনা নয়। কিন্তু হাসান আসকার রিজভি মনে করেন, পাকিস্তান চায় ভবিষ্যতে কাবুলে যে সরকারই আসুক না কেন তালেবান যেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়।

কেন তালেবানের ওপর পাকিস্তান এত ভরসা করছে? হাসান আসকার রিজভি বলেন, ‘যদিও বিষয়টি এমন নয় যে, তালেবান এখন পাকিস্তানের কথায় উঠাবসা করে, সেটা যারা ভাবেন তারা ভেতরের খবর ঠিকমত জানেন না। কিন্তু তারপরও ইসলামাবাদ মনে করে তালেবান ভারতের চেয়ে পাকিস্তানকে প্রাধান্য দেবে। তালেবানের কাছে ভারত একটি অমুসলিম দেশ। তাদের কাছে বিষয়টা খুব স্পষ্ট।’

হাসান আসকার রিজভি বলেন, পাকিস্তানের দৃঢ় বিশ্বাস, আফগানিস্তানে গত এক দশকে ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব যেভাবে বেড়েছে তা তাদের নিরাপত্তার জন্য গভীর হুমকি তৈরি করেছে। পাকিস্তান বিশ্বাস করে আফগান গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগসাজশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিদের মদত দিচ্ছে, বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাহায্য করছে। পাকিস্তান এই অবস্থার পরিবর্তন চায়।

তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। ১৯৯০-এর দশকে আফগান গৃহযুদ্ধে তালেবানকে সমর্থন দিয়েছে ইসলামাবাদ। ১৯৯৬ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর যে মাত্র তিনটি দেশ তাদের বৈধ সরকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল তাদের একটি ছিল পাকিস্তান।

তালেবানের নেতারা পাকিস্তানে আশ্রয় পেয়েছেন। এমনকী ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের যে শান্তি চুক্তি হয়, তার পেছনেও মূল ভূমিকা ছিল ইসলামাবাদের। যুক্তরাষ্ট্রও সেটা একবাক্যে স্বীকার করে।

অন্য তালেবান!

অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করেন তালেবান যে পাকিস্তানের বশংবদ, তা নয়। প্রমাণ হিসাবে তারা বলছেন, দোহায় মীমাংসা বৈঠকে তালেবানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কট্টরপন্থী ইমাম মোল্লা আব্দুল হাকিম। কিন্তু পাকিস্তান চেয়েছিল প্রয়াত তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের ডেপুটি আব্দুল গনি বারাদার - যার সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস – তিনি যেন মীমাংসায় নেতৃত্ব দেন।

কূটনীতি বিষয়ক বিশেষ মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসিতে গবেষক ফাহাদ হুমায়ুন লিখেছেন, তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে এখন এমন কেউ কেউ উঠে আসছেন যারা তাদের পুরনো নেতাদের মত পাকিস্তানের সঙ্গে তেমন ঘনিষ্ঠ নয়। সেই সম্পর্কের ইতিহাসও তারা তেমন জানেন না।

ফাহাদ হুমায়ুন মনে করেন, নতুন একদল তালেবান নেতা এখন তাদের স্বার্থ রক্ষায় ইসলামাবাদের চাইতে এখন দোহার দিকেই বেশি তাকান।

হাসান আসকার রিজভি বলেন, আফগানিস্তানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তালেবানের একটি অংশ যেভাবে কট্টর অবস্থান নিয়েছে, পাকিস্তানের মধ্যেও তা নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে। ইসলামাবাদ হয়তো এখন পুরোপুরি একটি তালেবান সরকারও চায় না।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের মধ্যে একটি আশঙ্কা এখন কাজ করছে যে, আফগানিস্তানে তালেবান যদি পূর্ণ ক্ষমতায় বসে তাহলে একসময় পাকিস্তানের জন্য তা হুমকি তৈরি করতে পারে।

তেহরিক-ই-তালেবানের (টিটিপি) মতো পাকিস্তানি তালেবান গোষ্ঠীর সঙ্গে হয়তো আফগান তালেবানের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে। জাতিসংঘের এক হিসাবে কমপক্ষে ছয় হাজার পাকিস্তানি তালেবান এখন আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধে শামিল রয়েছে। তারপরও পাকিস্তান মনে করছে, আফগানিস্তানে ক্ষমতায় তালেবানের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ তাদের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভালো বিকল্প।

পাকিস্তানের চির দুশমন ভারতের জন্য অবশ্য এই চিত্র একেবারেই বিপরীত। আফগানিস্তানে আবারও একটি তালেবান সরকার এবং তাদের নেতৃত্বে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দিল্লির মোদি সরকারে কাছে একটি দুঃস্বপ্নের মতো।

ভারত কেন এতো উদ্বিগ্ন?

দিল্লিতে জওহারলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটির (জেএনইউ) দক্ষিণ এশিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজ বিবিসি-কে বলেন, ‘তালেবান যদি একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের বিরুদ্ধে বেঁকে বসে, তাহলে ভারত ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক জটিল হয়ে পড়বে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’

অধ্যাপক ভরদোয়াজ মনে করেন, তালেবান ভারতবিরোধী কট্টর ইসলামপন্থীদের সমর্থন করেছে। সে কারণেই ভারত সবসময় চেয়েছে শান্তি আলোচনা যেন আফগান সরকারের নিয়ন্ত্রণে হয়।

শুধু অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নয়, বরং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য এবং চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে দিল্লির বিবাদের মধ্যে ভারসাম্যের জন্য ভারতের কাছে আফগানিস্তানের গুরুত্ব অনেক। আফগানিস্তানের উত্তরে ইরান ছাড়াও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ রয়েছে। পূর্বে পাকিস্তান এবং ইরান-পাকিস্তান পেরিয়ে দক্ষিণে ভারত মহাসাগর।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এ কারণে গত এক দশকে আফগানিস্তানের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতিতে ভারত তাদের ভূমিকা বাড়িয়েই চলেছে। সামাজিক অবকাঠামো এবং সড়ক, সেতু, বাঁধ ইত্যাদি প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ডলার; যা যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বেশি।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আফগান ব্যাংকিং, তথ্য প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য খাতে এক হাজার ৭০০ ভারতীয় কাজ করছে। বহু ভারতীয় কোম্পানি সেখানে অফিস খুলে ব্যবসা করছে। আর সে কারণেই আফগানিস্তানের ক্ষমতায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে দিল্লি বেশ চিন্তিত।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দোহার সভায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অনলাইনে অংশ নিয়ে ভাষণ দিয়েছেন। ভারতের একজন কূটনীতিক জেপি সিং দোহায় গিয়ে হাজির হয়েছেন।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আফগানিস্তানে তাদের স্বার্থহানি যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমাগত দেন-দরবার চালিয়ে যাচ্ছে ভারত।

ভারতের তালেবান সমস্যা

ভারত কোনওভাবেই চাইছে না, আফগানিস্তানে তালেবানের প্রভাব এমন হোক যাতে দেশটি আবার কট্টর একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। দিল্লি জানে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ এবং ভারতকে নিয়ে তালেবানের কোনও আগ্রহ নেই।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অশোক সজ্জনহার বিবিসি হিন্দি-কে বলেন, তালেবান এখন আর আগের মতো কট্টর ইসলামী সংগঠন নেই। ভারতের ব্যাপারে তাদের মনোভাবেও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, ২০১৮ সালের নভেম্বরে যখন রাশিয়া তালেবানের কয়েকজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানায় তখনও পর্যবেক্ষক হিসাবে সেখানে দুই জন সাবেক ভারতীয় কূটনীতিকের উপস্থিতি তালেবান মেনে নিয়েছিল।

অশোক সজ্জনহার বলেন, ‘১৯৯০-এর দশকের তালেবান আর এখনকার তালেবান এক নয়। তারা ইসলামী রাষ্ট্র চায়, কিন্তু একইসঙ্গে সেখানে সবার অংশগ্রহণে তাদের ততটা আপত্তি এখন আর নেই। তারা জানে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি তাদের প্রয়োজন।’

সজ্জনহার মনে করেন, সাধারণ আফগান জনগণের মধ্যে ভারতের প্রতি মনোভাব ইতিবাচক। তার ভাষায়, ‘তারা জানে ভারত যেভাবে তাদের সাহায্য করছে সেটা আর কেউ করবে না। ভবিষ্যতে যে সরকারই আসুক না কেন, এই বাস্তবতা তারা অস্বীকার করতে পারবে না।’

শুধু তালেবান বা পাকিস্তান নয়, আফগানিস্তানের ব্যাপারে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের আগ্রহ যেভাবে বাড়ছে সেটাও ভারতের মাথাব্যথার আরেকটি কারণ। চীন সম্প্রতি আফগানিস্তানের তামা এবং লোহার খনিতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। চীন ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সাহায্য নিয়ে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে পারে- এমন আশঙ্কাও ভারতের রয়েছে।

দোহার বৈঠকে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে মীমাংসা হবেই, তা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, মার্কিন নির্বাচনের আগে হয়তো একটি লোকদেখানো নাটক হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আজ হোক আর কাল হোক তাদের সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করবেই। তখন যে আফগানিস্তান অনেকটাই বদলে যাবে তা নিয়ে কারোই তেমন সন্দেহ নেই। সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

সর্বশেষ সংবাদ